বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: প্রত্যাবর্তনের পর সামনে অগ্নিপরীক্ষা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু দল কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়; তারা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি দীর্ঘ অধ্যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি তেমনই একটি নাম। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, একদলীয় ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ তখন একটি অনিশ্চিত সময় পার করছিল। তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতির সংকটকালে হাল ধরেন।
১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। দলের ঘোষণায় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, জাতীয় ঐক্য, বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পৃথক ধারার ভিত্তি তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। অর্থাৎ জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে।
কিন্তু বিএনপির ইতিহাস কেবল ক্ষমতার ইতিহাস নয়। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউজে কতিপয় বিপথগামী সামরিক বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতায় জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি নিহত হওয়ার পর দলটি নেতৃত্বের বড় সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলে।
১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর এরশাদের পতন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় দলটির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯১সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করে।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতির মতো বিএনপির পথও কখনো সহজ ছিল না। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে যায়। মাত্র পাঁচ বছর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটি আবার বড় বিজয় অর্জন করে। বিএনপি এককভাবে ১৯৩টি আসন পায় এবং চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হয়।
এরপর আসে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত এবং ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ফলাফল ছিল বড় ধাক্কা, দলটি মাত্র ৩০টি আসন পায়। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন বর্জন, অংশগ্রহণ, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংকট—সবকিছু মিলিয়ে দলটির সামনে কঠিন সময় তৈরি হয়।
২০০৮ থেকে ২০২৪, এই দীর্ঘ ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার হাতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কবর রচনা হয়। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে লড়াই করে বিএনপির মাঠে থাকা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় ১৭ বছর দলটি সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই সময়ে দলটির ওপর মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক সংকট এবং নেতৃত্বের নানা চ্যালেঞ্জ এসেছে। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা মনোভাব ও আপসহীন নেতৃত্বে তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমর করে তোলে এবং বিএনপি দল হিসেবে রাজনীতিতে টিকে যায়।
২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আবার নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পায়।
এটি নিঃসন্দেহে দলটির ইতিহাসে একটি বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। কিন্তু ক্ষমতায় ফেরা যেমন অর্জন, তেমনি বড় পরীক্ষা। বিরোধী দলে থাকাকালে জনগণের কাছে যে প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল, এখন সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বও বিএনপির ওপর।
বিএনপি যদি তার ৪৮ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সহনশীলতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার রাজনীতি করতে পারে, তাহলে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু দলটির জন্য নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে উঠতে পারে।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশের জনগণ সেই প্রত্যাশাই করে।



আপনার মতামত লিখুন