গাজায় একের পর এক ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৭
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। এসব হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১২ জনের বেশি। চিকিৎসাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
বৃহস্পতিবার গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-সুদানিয়া, রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এবং খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনই গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন।
চিকিৎসাসূত্র জানায়, গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-তাওয়াম এলাকার মিসরীয় ক্যাম্পে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় আহত মোহাম্মদ রাজাব ওয়ারশ আগা মারা গেছেন।
গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক নারী ও এক শিশু নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। এর আগে ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উত্তরাঞ্চলীয় মাঠ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ওই হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলের তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি বেসামরিক গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের একজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের আল-শিফা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক চিকিৎসক।
এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম গাজা সিটির আমের প্রজেক্ট এলাকায় একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে এক ফিলিস্তিনি নারী নিহত হন। আহত হন তার স্বামী ও দুই সন্তান। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসক ওই নারীর নাম আহলাম মুবারক (৩০) বলে জানিয়েছেন। তার স্বামীর অবস্থা গুরুতর।
অন্যদিকে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত আহমেদ খামিস আবু নাজা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গাজা সিটির উপকূলে ফিলিস্তিনি নৌযান ও উপকূলীয় এলাকায় ইসরায়েলি নৌবাহিনী গুলি ও গোলাবর্ষণ করেছে। উত্তর-পশ্চিম গাজা উপত্যকার আল-সুদানিয়া এলাকাতেও গোলাবর্ষণ করা হয়।
দক্ষিণ গাজার রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে সাতজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান করা এলাকাগুলোতে আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বানি সুহেইলা গোলচত্বরের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের ছোড়া ধোঁয়া বোমা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের কয়েকটি তাঁবুতে আগুন ধরে যায় বলেও জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত সম্মত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৪৬৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১৬১ জন আহত হয়েছেন।
২০০৭ সাল থেকে গাজায় স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে কঠোর অবরোধ বজায় রেখেছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পেছনে এই অবরোধকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ফিলিস্তিনি ও জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। উপত্যকাটির প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে বলেও এসব পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলতে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এ ছাড়া গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে যুদ্ধবিরতির কাঠামো ও আঞ্চলিক শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্তে মতবিরোধের কারণে আলোচনা কার্যত অচল হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।


