দেশের গন্ডি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় যাচ্ছে ঝিনাইদহের গুড়
হাড় কাঁপানো তিব্র শীত ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় ব্যাপকভাবে খেজুরের গুড় উৎপাদন শুরু হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বেড়েছে গুড়ের বেচাকেনা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর গুড়ের মান ভালো হওয়ায় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন গাছিরা। হাট-বাজারের পাশাপাশি অনলাইনে খেজুরের গুড়ের বাজারও জমে উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার ৬টি উপজেলায় মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রস আহরণযোগ্য গাছ প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০টি। চলতি শীত মৌসুমে জেলা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ২৪১ লিটার খেজুরের রস এবং প্রায় ৮৭২ মেট্রিক টন খেজুরের গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। উৎপাদিত গুড় স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামের গাছি আব্দুর রশিদ গণমাধ্যমে জানান, তিনি প্রতি বছর কানাডায় খেজুরের গুড় পাঠান। গ্রামের প্রবাসী আব্দুল্লাহ আল মামুন তার কাছ থেকে নিয়মিত গুড় কিনে থাকেন। তিনি বলেন, এক ভাড় গুড় ১ হাজার ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষ্ণপুর এলাকার সাইফুল ইসলাম লিকু জানান, তার বড় ভাই আমেরিকায় বসবাস করেন। প্রতিবছর সেখানেও গুড় পাঠানো হয়।
কোটচাঁদপুর উপজেলার শিবনগর গ্রামের গাছি মহিরউদ্দীন বলেন, স্থানীয় গাছিরা সাবদারপুর হাটে গুড় বিক্রি করতে আসেন। এ হাটে ভেজাল গুড় খুব কম পাওয়া যায়। গুড়ের মান ভালো হওয়ায় দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এখানে আসেন। তিনি জানান, এক জোড়া গুড় তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
শৈলকূপা থানার আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, তিনি অনলাইনে খেজুরের গুড় বিক্রি করেন। আত্মীয়স্বজন ও দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতারা তার কাছ থেকে গুড় কিনে থাকেন। তিনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছির কাছ থেকে প্রতি কেজি ২৬০ টাকা দরে গুড় কিনে তা অনলাইনে বিক্রি করেন। এতে বেশ ভালো মুনাফা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কোটচাঁদপুরের সাফদারপুর গুড় হাটের ইজারাদার আবুল কাশেম বাবু গণমাধ্যমে বলেন, ঝিনাইদহ অঞ্চলে আগের তুলনায় খেজুর গাছ কিছুটা কমেছে। তবে নতুন চারা স্বাভাবিকভাবেই গজিয়ে উঠছে। সরকার যদি খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নেয়, তাহলে গাছিরা আরও উৎসাহিত হবে। শীত মৌসুমে কৃষকরা রস ও গুড় বিক্রি করে ভালো আয় করেন।
তিনি আরও জানান, প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছরের পুরোনো সাফদারপুর হাটে প্রতি সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার গুড়ের হাট বসে। সপ্তাহে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার গুড় বেচাকেনা হয় এই হাটে। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন আরও বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, ঝিনাইদহ জেলায় মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি খেজুর গাছ রয়েছে এবং এ বছর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ অনুকূল আবহাওয়া ও কনকনে শীত। তিনি বলেন, জেলায় ছোট-বড় ১৯৭টি হাট-বাজারে খেজুরের গুড় বিক্রি হয়। এসব হাটে সপ্তাহে দুই দিনে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার গুড় লেনদেন হচ্ছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস, গ্রামের ব্যবসায়ী, গাছি ও গণমাধ্যমের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।



আপনার মতামত লিখুন