দৈনিক ৫ কোটি টাকা পাচার: ৬,৫০০ সিমসহ অনলাইন জুয়া চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
১৭ জুলাই ২০২৬ ১:১৩ এএম
দৈনিক ৫ কোটি টাকা পাচার: ৬,৫০০ সিমসহ অনলাইন জুয়া চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার

বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইট সমূহে এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দৈনিক ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার উপরে লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে। যা দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে নিয়মিত। গাজীপুর ও কুমিল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল সরঞ্জামসহ অনলাইন জুয়া পরিচালনার চক্রের মূল হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাতসহ চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

ডিবি বলছে, এই চক্রের মূলহোতা অবৈধ এই জুয়া পরিচালনার মাধ্যমে দেশে চক্রের মূল হোতা আরিফুল দৈনিক ৫ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করতেন। আর দেশের বাইরে থেকে এই চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন চাইনিজ নাগরিক নাতান।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম।

যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তারা হলেন:
মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিবি কর্তৃক গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টি এমএফএস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট সম্বলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, একটি ল্যাপটপ, ৭০ এর অধিক মোবাইল ডিভাইস ও একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়।

ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশন কর্তৃক সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে জুয়ার বেশ কিছু ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন শনাক্ত করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনলাইন জুয়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাইটগুলোতে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্টের ব্যবহার করা হয়। জুয়ার সাইট ও মোবাইল অ্যাপস থেকে প্রাপ্ত এমএফএস অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা হয়।

তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে চক্রের মূল হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত সহ ৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা ডিবির সহায়তায় কুমিল্লা সদরের এলিট প্যালেস হোটেলে অভিযান চালিয়ে আরও ৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণের জন্য তারা বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে কাজটি পরিচালনা করতো।

অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনার কাজে অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্য কিছু পেমেন্ট কোম্পানি হলো পে কাশমা, গো পে, লাকি পে, এলকিউ পে, এক্সই পে ও কুল পে। বাংলাদেশ কেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা চালানোর জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। এই কারণে তারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে। জুয়ার সাইট এবং অ্যাপস পরিচালনার জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এই অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) থেকে ক্রিপ্টো ডলার (ইউএসডিটি) ক্রয় করা হয়। পরবর্তী সময়ে পেমেন্ট কোম্পানির দেওয়া ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ক্রিপ্টো ডলার পাঠানো হয়।

তিনি আরও বলেন, আরিফসহ যে চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ জানা গেছে, এখানে প্রায় দৈনিক ৫ কোটি টাকার লেনদেন করা হতো। আরিফ আগেও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে। আরিফ অবৈধ উপার্জনের টাকায় বিলাশী জীবনযাপন করেন। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে তার একটি বিএমডব্লিউ উল্টে গেছে। এরপর তিনি আবার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনেছেন।

পুলিশে হাত থেকে বাঁচতে ভিন্ন কৌশলের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যেখান থেকে তাকে ধরেছি, সেখানেও তিনি তিনটা রুম বুকিং করেছিলেন। তিনি যে রুমে ছিলেন, সেই রুমের ভাড়াই প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা। তিনি এখানে হয়ত চার-পাঁচ দিন থাকতেন। এরপর পুলিশ যখন তাকে লোকেট করবে, ঠিক তখন তিনি জায়গা পরিবর্তন করে অন্য কোনো হোটেলে বা কক্সবাজারে নামি-দামি হোটেলে রুম ভাড়া করতেন। দীর্ঘদিন তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই কৌশল অবলম্বন করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি এই চক্রের বস নাথানের ছদ্মনাম এলিয়েন। তিনি একজন চাইনিজ নাগরিক।

দেশে জুয়ার সাইট থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের দেশে ৭০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা ট্রানজেকশন হচ্ছে।

এই সিমগুলো যেসব মার্চেন্ট বা দোকানদারের নামে রেজিস্ট্রেশন করা আছে, তাদেরকে আপনারা আইনের আওতায় আনবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এই সিমের মালিকদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করছি এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরকেও গ্রেপ্তার করা হবে। এর আগে যারা বিকাশ ও নগদ কোম্পানির সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...