ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩:৩৯ পিএম
ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি

ই-টিন নিবন্ধন থাকলেই আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে সবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে, বিষয়টি এমন নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার আগে আয় নিরূপণ হয়েছে কিনা এবং আইনের কোন বিধান তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার ওপর।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে, এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে জরিমানার হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে এ জরিমানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার ওপর আরোপ হয় না; আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত? আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ধারা ১৬৬, ১৭২, ১৯১, ১৯৩ বা ২১২-এর অধীন রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

আইনের বিধান অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

Advertisement

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে আইন। আগে আয় নিরূপণ হয়নি: ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।আগে আয় নিরূপণ হয়েছে: সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেটিই সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা। অর্থাৎ, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা। এটি সবার জন্য নির্ধারিত বা স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়। জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে আইনের শর্ত ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচ্য।

ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হয় আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে সবাই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত—এমন নয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে যাদের রিটার্ন দাখিল করতে হয়, তাদের মধ্যে রয়েছেন—

যাদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।

যাদের ক্ষেত্রে আইনের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী আগের বছরগুলোতে আয় নিরূপণ বা করযোগ্য আয়ের বিষয়টি প্রযোজ্য।

ফার্মের অংশীদার।

কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।

সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি।

যাদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে হয়।

এ ছাড়া আইন অনুযায়ী অন্যান্য শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে। তাই শুধু ই-টিন আছে কিনা, কিংবা আয় করযোগ্য কিনা—এ দুটি বিষয় দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

আয়কর রিটার্ন জমার শেষ তারিখ কখন?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। এই সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। তবে এনবিআর কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষের জন্য সময়সীমা বাড়ালে সংশ্লিষ্ট বর্ধিত সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। বিগত করবর্ষে (২০২৫-২০২৬) স্বাভাবিক সময়সীমা ৩০ নভেম্বর হলেও তা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দেরিতে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানার বিষয়টি যাচাই করতে হবে। করদাতার পরিস্থিতি ও আইনের প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

ই-টিন আছে, কিন্তু আয় করযোগ্য নয়—করণীয় কী? অনেকে ব্যাংকিং, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরে তাদের আয় কমে যেতে পারে বা সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা জরুরি। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে যাওয়া বা বর্তমানে কর দিতে না হওয়ার কারণে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। প্রযোজ্য শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। তবে বাতিলের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের যাচাই ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। টিআইএন বাতিল এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়।

যেভাবে নিজের রিটার্নের অবস্থা যাচাই করবেন

ই-টিন নেওয়ার পর কোনো করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন কিনা, তা নিশ্চিত না হলে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন

এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল https://etaxnbr.gov.bd/ -এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

২. রিটার্ন জমার রেকর্ড দেখুন

কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তিস্বীকার বা রিটার্নের রেকর্ড রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।

৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে ব্যবস্থা নিন

যে করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করুন। দেরির কারণে কোনো কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা-ও যাচাই করুন।

৪. জরিমানার নোটিশ পেলে কর অফিসে যোগাযোগ করুন

আরও পড়ুন
আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে?
আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে?
জরিমানার নোটিশ পেলে কোন করবর্ষে এবং কী কারণে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।

অনলাইনে রিটার্ন জমার আগে সতর্কতা

রিটার্ন দাখিলের সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন এবং আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য যথাযথভাবে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর ও উৎসে কর্তিত করের তথ্য যাচাই করতে হবে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে নিজের এনআইডি, টিআইএন, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য দেবেন না।

২০২৬-২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু শ্রেণির করদাতা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে।

ই-টিন থাকার পরও আয়কর রিটার্ন জমা না দিয়ে থাকলে প্রথমেই নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ৫ হাজার টাকা জরিমানার তথ্য দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে করদাতার আগের আয় নিরূপণ, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করতে হয়।

তাই সবার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের জরিমানা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কিনা এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য কিনা, তা নিশ্চিত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...