বিএনপি নেতাকে ‘দুষ্কৃতকারীর’ তালিকায় রেখে বিকেলে পুলিশের গণবিজ্ঞপ্তি, মধ্যরাতে সংশোধন

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ৫:৫৪ পিএম
বিএনপি নেতাকে ‘দুষ্কৃতকারীর’ তালিকায় রেখে বিকেলে পুলিশের গণবিজ্ঞপ্তি, মধ্যরাতে সংশোধন

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) নগরজুড়ে ৩৩০ জনকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। নগরীর শান্তি–শৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তার কথা জানিয়ে জারি করা এই তালিকায় বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী, যাদের গত অন্তত এক বছরে প্রকাশ্যে নগরে দেখা যায়নি। তালিকায় রাখা হয়, তিন মাস আগে মারা যাওয়া এক আওয়ামী লীগ সমর্থক সাবেক কাউন্সিলরও। যদিও সমালোচনার মুখে পরে তার নাম কেটে নতুন তালিকা প্রকাশ করে সিএমপি।

এছাড়া তালিকার তিন নম্বরে রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তবে গণবিজ্ঞপ্তি জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা সংশোধন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মধ্যরাতে পাঠানো সংশোধিত তালিকা থেকে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজম খাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার বিকেলে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে ৩৩০ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। সেখানে ৪ নম্বর ক্রমিকে ছিল বিএনপি নেতা শওকত আজম খাজার নাম। গণমাধ্যমে এই তালিকা পাঠানোর পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে দিবাগত রাত ১২টা ২৪ মিনিটে পুলিশ পুনরায় সংশোধিত তালিকা পাঠায়, যেখানে শওকত আজমের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মহানগর এলাকায় শান্তি–শৃঙ্খলা রক্ষা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৩৩০ জনের চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৪০,৪১ ও ৪৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

‘দুষ্কৃতিকারী’ হিসেবে তালিকাভুক্তদের মধ্যে আছেন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম, আওয়ামী লীগ নেতা খলিলুর রহমান নাহিদ, চসিকের সাবেক কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু, শৈবাল দাশ সুমন, গাজী শফিউল আজম, শাহেদ ইকবাল বাবু, শফিকুল ইসলাম, এসরারুল হক, মোহাম্মদ কাজী নুরুল আমিন, মোবারক আলী, মোরশেদ আলম, জহুরুল আলম জসিম, নিছার উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল, ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী, আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলাল, গিয়াস উদ্দিন, শহিদুল আলম, হারুনুর রশিদ, নুরুল আলম, চৌধুরী হাসান মাহামুদ হাসানি, মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ, নাজমুল হক ডিউক, মোহাম্মদ জাবেদ, আব্দুর সবুর লিটন, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, শেখ জাফরুল হায়দার চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাহাদুর, মোহাম্মদ জুবায়ের, আতা উল্লাহ চৌধুরী, আব্দুস সালাম, বাবু জহুর লাল হাজারী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, পুলক কাস্তগীর, হাজী নুরুল হক, মোর্শেদ আলী, আব্দুল মন্নান, গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী, জিয়াউল হক সুমন, আবদুল বারেক, সালেহ আহমদ চৌধুরী, যুবলীগ নেতা দেবাশীষ পাল দেবু, ছাত্রলীগ নেতা নুরল আজিম রনি, জাকারিয়া দস্তগীরসহ অনেকে।

তালিকায় আরও রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী প্রকাশ সাজ্জাদ, সাজ্জাদ প্রকাশ ছোট সাজ্জাদ, ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, বার্মা সাইফুল, রায়হান, বোরহান, মোবারক হোসেন ইমন, হাড্ডি জনি, চুক্কু, ডেনডাইয়া, গিট্টু মানিক, টারজেন, গলাকাটা রইন্যা, অস্ত্র মিলন, নলা কাসেম, বাইক বাবু, সুমন চন্দ্র দাশ, পিচ্চি জাহিদ, হাত কাটা ইদু, কালা জাহিদ, কট নাজিম, ডাকাত ইউসুফ, বুইশ্যা, কার মাসুদ, কানা কুদ্দুস, সোর্স আনোয়ার, লাল বাদশা, পিচ্ছি কাওসার, লাল সাগর, পিচ্চি সাবু, কালা নোমান, মাছ কাদের, কানা মাসুদ, ঢাকাইয়া সুমন, ব্লেড রুবেল, ডাইল জাহেদ, কসাই সোহেল, ডিবি ফয়সালসহ আরও অনেকে।

রাষ্ট্রদ্রোহ ও আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় কারাবন্দি ইসকনের সাবেক সংগঠক চন্দন কুমার ধর ওরফে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর নাম দুষ্কৃতকারীর তালিকায় উঠেছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৩০ নম্বর মাদারবাড়ি ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আতাউল্লাহ চৌধুরী গেলো বছরের নভেম্বরে মারা গেলেও তাঁর নাম বহিষ্কার তালিকায় ছিলো ২২৭ নম্বরে। যদিও তালিকা প্রকাশের কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হলে, তাঁর নাম বাদ দিয়ে নতুন তালিকা প্রকাশ করে সিএমপি।

উল্লেখ্য, তালিকায় সন্ত্রাসী, চোর, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের নাম একসাথে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের ভাষ্য, এতে তালিকাটি এক ধরনের জগাখিচুড়ি হয়ে গেছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনার আসামিরা এখনো অধরা থাকলেও ২০২৪ সালের পর দায়ের হওয়া বহু বিতর্কিত মামলার আসামিদের দুষ্কৃতিকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে আরও তদন্ত ও চার্জশিট দরকার। তবে মামলার ক্রিমিনাল ডাটাবেইজ অনুযায়ী তাঁদের অপরাধ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তালিকায় নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামও রয়েছে, যাদের কেউ পলাতক, কেউ কারাবন্দি। সিএমপি সূত্র জানায়, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ধারা ৪০, ৪১ ও ৪৩ মহানগর এলাকায় জনশৃঙ্খলা রক্ষা, বিপজ্জনক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কার বা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। ধারা ৪০-এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি শান্তি ভঙ্গ বা অপরাধের কারণ হলে তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহিষ্কার করা যায়। ধারা ৪১ পুনরায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ দেয়। ধারা ৪৩ অনুযায়ী এসব আদেশ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বলবৎ থাকে, প্রয়োজন হলে জননিরাপত্তার স্বার্থে মেয়াদ বাড়ানো যায়।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...