বিদ্যুতের মিটার জিম্মি করে চাঁদাবাজি

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ পিএম
বিদ্যুতের মিটার জিম্মি করে চাঁদাবাজি

রাতের আঁধারে খুলে নেওয়া হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা মিলের বিদ্যুতের মিটার। খুলে নেওয়া মিটার নিয়ে দূরে পালিয়ে যায় না চক্রটি। অনেক সময় ঘটনাস্থলের আশপাশের নির্জন স্থানে লুকিয়ে রেখে যায়। এরপর মিটার বক্সে সাঁটিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট একটি চিরকুট। তাতে লেখা থাকে একটি মোবাইল নম্বর। সেই নম্বরে ফোন করলেই অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, টাকা দিলে মিটার ফেরত পাওয়া যাবে।

টাকা পাঠাতে হবে বিকাশ বা নগদে। টাকা পাওয়ার পর জানিয়ে দেওয়া হয়, কোথায় রাখা হয়েছে মিটারটি; অর্থাৎ মিটার খুলে নেওয়াই শেষ কথা নয়। বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মিটারটিকেই যেন ‘জিম্মি’ বানানো হয়। এরপর সংযোগ সচল করার তাগিদকে কাজে লাগিয়ে চলে দর-কষাকষি। শিল্পকারখানা, রাইস মিল, সমিল কিংবা সেচপাম্পের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর এই চাপকেই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্র।

সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, সাটুরিয়া, পাবনা, বুড়িচং, লালপুর, পুঠিয়া, কামারখন্দ, সুন্দরগঞ্জ ও কুষ্টিয়ার মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে একই কৌশলে মিটার খুলে নিয়ে টাকা দাবির ঘটনা ঘটেছে।

গত ৫ আগস্ট ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা এলাকায় ‘দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’-এর এক নম্বর গেটের সামনে থেকে পল্লী বিদ্যুতের একটি মিটার চুরি হয়। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় মামলা হলে ছায়া তদন্ত শুরু করে শিল্প পুলিশ-১। এরই ধারাবাহিকতায় ২ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকার ঘোড়াপীর মাজারসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সবুজ মিয়া ও মারুফ মোল্লা নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে শিল্প পুলিশ।

শিল্প পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন মিটার চুরি করে অর্থ আদায়ের কৌশল সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। গ্রেপ্তার সবুজের দাবি, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০টি মিটার খুলে একই কায়দায় অর্থ আদায় করেছেন। আর মারুফের দাবি, তিনি এ পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০টি ঘটনায় জড়িত।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি রাতে টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানের মিটার খুলে কাছাকাছি কোনো নির্জন স্থানে লুকিয়ে রাখত। মিটার বক্সে রেখে যেত একটি মোবাইল নম্বর। প্রতিষ্ঠানের লোকজন ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে শুরু হতো দর-কষাকষি। একটি মিটার ফেরত দিতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা দাবি করা হতো। টাকা পাওয়ার পর জানানো হতো মিটার কোথায় রাখা আছে।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে আসছে। চক্রের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে একমি ল্যাবরেটরিজ, বাংলাদেশ জেডব্লিউটি কোম্পানি, প্যাক অ্যান্ড টিম প্যাকেজিং লিমিটেড, স্টারলিং লন্ড্রি অ্যান্ড ডেনিমস লিমিটেড, কাইজেন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, ম্যাকটেক করপোরেশন, আয়েশা ক্লোথিং, ইফাদ অটোস, ট্রেন্ড সেটার্স ট্রিমস ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউবেস্ট (বাংলা) ফ্যাশন, টর্ক ডিজাইন, এমএম মাল্টিমাইন্ড নিট গার্মেন্টস, সিনলিয়ান ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি বাংলাদেশ এবং ফেব্রিলাইফ ফ্যাশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মিটার রাতের আঁধারে খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই চক্রের দাবি করা টাকা পরিশোধ করে দ্রুত মিটার ফিরিয়ে নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্রমতে, শুধু সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত সেপ্টেম্বরে রংপুরের তারাগঞ্জে এক রাতেই চারটি মিটার খুলে নেওয়ার পর একটি মিটার বোর্ডে মোবাইল নম্বর লিখে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এর আগে আগস্ট মাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি পোস্টপেইড ডিজিটাল মিটার খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। জুলাইয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুরে একই রাতে আটটি মিটার খুলে নেওয়া হয়। সেখানেও মিটার খুলে বিকাশ নম্বর রেখে টাকা দাবি করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে নাটোরের লালপুরে এক রাতে ১০টি রাইস মিল ও সমিলের বৈদ্যুতিক মিটার রাতের আঁধারে খুলে নেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে রেখে যাওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে বিকাশের মাধ্যমে ৮ হাজার টাকা পাঠানোর দাবি করা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর ও বেলপুকুর এলাকায় এক রাতে ১১টি মিটার খুলে নেওয়া হয়। চিরকুটে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে মিটার ফেরত পেতে ৬ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়।

নভেম্বরে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে এক রাতেই সেচ ও শিল্পশ্রেণির ১৫টি বৈদ্যুতিক মিটার খুলে নেওয়া হয়। সেখানেও মিটার বক্সে চিঠি রেখে দেওয়া হয়েছিল বিকাশ নম্বর। নওগাঁর মান্দাতেও মিটার খুলে নিয়ে চিরকুটে মোবাইল নম্বর রেখে প্রতি মিটার ফেরত পেতে ১০ হাজার টাকা দাবি করার ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালের মে মাসে পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও আটঘরিয়া এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মিটার খুলে নিয়ে মিটার বোর্ডে মোবাইল নম্বর লিখে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। যোগাযোগ করলে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। বিকাশে টাকা পাঠানোর পর মিটার কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানিয়ে দেওয়া হতো। একই বছর কুমিল্লার বুড়িচংয়েও শিল্প মিটার খুলে নিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মিটার ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরও আগে, ২০২১ সালের জুনে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় আটটি মিলের থ্রি-ফেজ মিটার খুলে নেওয়া হয়। তখনো মিটার বোর্ডে মোবাইল নম্বর রেখে দেওয়া হয়। যোগাযোগ করলে মিটার ফেরতের জন্য ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা পাঠানোর পর মিটার কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানিয়ে দেওয়া হয়।

অপরাধ বিশ্লেষক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনাকে নিছক চুরি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে একটি প্রতিষ্ঠানকে অচল করা, সেই অচলাবস্থাকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করা এবং পরে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আদায়— এই তিন ধাপ মিলে এটি একটি স্বতন্ত্র অপরাধ মডেলে পরিণত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তে অপরাধের ধরনের সঙ্গে মোবাইল নম্বর, বিকাশ ও নগদ নম্বর এবং ক্যাশআউটের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা এজেন্টের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি মিটার চুরির আগে টার্গেট করা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে চক্রটি কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।’

বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাগুলোর সময়কাল ও স্থান আলাদা হলেও কৌশলের মিল স্পষ্ট। রাতের বেলা মিটার খুলে নেওয়া, চিরকুটে নম্বর রেখে যাওয়া, ফোনে দর-কষাকষি, ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা নেওয়া এবং এরপর মিটারের অবস্থান জানানো। এ ধরনের ঘটনার বিশেষত্ব এখানেই। সাধারণ চুরিতে চোর কোনো বস্তু নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু এই মডেলে খুলে নেওয়া মিটার সব সময় বিক্রি করা হয় না; বরং মালিকের কাছেই সেটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়; অর্থাৎ চুরি হওয়া বস্তুটিই হয়ে ওঠে চাপ তৈরির হাতিয়ার। একটি শিল্পকারখানার মিটার খুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যেতে পারে মেশিন, থেমে যেতে পারে উৎপাদন। শ্রমিক বসে থাকতে পারেন। সরবরাহের সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে। অর্ডার আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ফলে মিটারের বাজারমূল্যের চেয়ে বিদ্যুৎসংযোগ সচল রাখার মূল্য অনেক বেশি। চক্রটি সেই বাস্তবতাকেই কাজে লাগাচ্ছে।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...